আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বও একটি বৈপ্লবিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কথাটি হলাে, মহাকর্ষ আসলে অন্যান্য বলের মতাে কোনাে বল নয়। আগে স্থান-কালকে সমতল মনে করা হতাে, সার্বিক । আর মহাকর্ষ। এই অসমতল স্থান-কালেরই ফলাফল। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তির উপস্থিতিতে স্থান-কাল বেঁকে যায়। পৃথিবীর মতাে বস্তুরা মহাকর্ষ নামক কোনাে বলের কারণে বক্র কক্ষপথে চলছে না, বরং বক্র কক্ষপথে চলার কারণ হলাে, এরা বক্র স্থানে সরলরেখা বরাবর নিকটতম বস্তুকে অনুসরণ করে। এই পথকে বলা হয় জিওডেসিক (Geodesic) । পারিভাষিক অর্থে এর মানে হলাে, কাছাকাছি দুটি বিন্দুর মধ্যে ক্ষুদ্রতম (বা বৃহত্তম) পথ।

চিত্র : এই গােল বস্তুকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ মনে করা হলে পৃথিবীর কেন্দ্রকে কেন্দ্র ধরে পৃষ্ঠের ওপর অঙ্কিত যেকোনাে বৃত্তই গুরুবৃত্ত হবে যেমন বিষুব রেখা বরাবর 'ক' যেমন গুরুবৃত্ত, তেমন ‘খ’ ও গুরুবৃত্ত সমতল দ্বিমাত্রিক স্থানের একটি উদাহরণ হলাে জ্যামিতিক তল ।
এখানে জিওডেসিকরা হলাে রেখা। পৃথিবীর পৃষ্ঠ দ্বিমাত্রিক বক্র স্থানের একটি উদাহরণ। এই পৃষ্ঠের জিওডেসিকদেরকে এক একটি গুরুবৃত্ত (Great Circle) বলা হয়। বিষুবরেখাও একটি গুরুবৃত্ত । পৃথিবীর পৃষ্ঠে যদি এমন কোনাে বৃত্ত আঁকা হয়, যার কেন্দ্র হবে পৃথিবীর কেন্দ্রেই, তবে সেটিও হবে গুরুবৃত্ত। (এদেরকে গুরুবৃত্ত বলার কারণ হচ্ছে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপর ওপরে সর্বোচ্চ এই আকারের বৃত্তই আঁকা যাবে)।
দুটি বিমানবন্দরের মধ্যে ক্ষুদ্রতম পথও একটি জিওডেসিক। তাই বিমানের ন্যাভিগেটররা পাইলটদেরকে এই পথ ধরে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেমন ধরুন, আপনি নিউ ইয়র্ক থেকে মাদ্রিদ স্পেন যাবেন । আপনি যদি কম্পাস নিয়ে এদের অক্ষাংশ বরাবর প্রায় সােজা পূর্ব দিকে চলেন তাহলে যেতে হবে ৩,৭০৭ মাইল পথ । আর যদি আপনি একটি গুরুবৃত্ত অনুসরণ করে প্রথমে উত্তর- পূর্ব ও পরে ক্রমান্বয়ে পূর্ব দিকে ঘুরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যান।
তাহলে যেতে হবে ৩,৬০৫ মাইল। পৃথিবীর মানচিত্রে পৃষ্ঠ বিকৃত করে ছড়ানাে থাকে বলে দুই পথের চিত্র বােঝা মুশকিল। আপনি যখন সােজা পূর্ব দিকে যাচ্ছেন, আসলে তখন আপনি সােজা যাচ্ছেন না। অন্তত এই অর্থে যে আপনি সবচেয়ে সরাসরি পথ তথা জিওডেসিক দিয়ে যাচ্ছেন না।
![]() |
চিত্র : পৃথিবীর পৃষ্ঠে বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব
|
দুটি স্থানের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব হলো একটি গুরুত্তের অংশ। সমতল মানচিত্রে দেখলে এটি কিন্তু সরলরেখা হবে না।
সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে চতুর্মাত্রিক স্থান-কালে বস্তুরা সব সময় জিওডেসিক দিয়ে চলাচল করে। পদার্থের অনুপস্থিতিতে চতুর্মাত্রিক স্থানকালের জিওডেসিক ত্রিমাত্রিক স্থানের সরলরেখার ন্যায় আচরণ করে। কিন্তু পদার্থের উপস্থিতি চতুর্মাত্রিক স্থান-কালকে বিকৃত করে দেয়। এর ফলে ত্রিমাত্রিক স্থানে চলতে থাকা বস্তুর পথ বেঁকে যায় । এই বেঁকে যাওয়ার প্রক্রিয়াটিই আগের নিউটনীয় তত্ত্বে মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যখ্যা করা হয়েছিল । পাহাড়ি এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান। দেখার সাথে এর তুলনা করা চলে।বিমানটি হয়তাে ত্রিমাত্রিক স্থানের মধ্য দিয়ে সরল পথেই চলছে । কিন্তু তৃতীয় মাত্রা তথা উচ্চতার কথা বাদ দিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের দ্বিমাত্রিক ভূমিতে নজর রাখলে দেখা যাবে বিমানের ছায়া একটি বক্র পথ অনুসরণ করছে।
![]() |
চিত্র : মহাকাশযানের ছায়ার চলাচলের পথ।
|


No comments
Post a Comment