অনেক সময় একটি বড় ভরের নক্ষত্র গুটিয়ে যাওয়ার সময় এর বহিঃস্থ অঞ্চল তীব্র বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরে ছিটকে পড়তে পারে। একে বলা হয় সুপারনােভা । এই বিস্ফোরণের এত শক্তিশালী যে এটি একাই পুরাে গ্যালাক্সির বাকি সব নক্ষত্রের চেয়ে উজ্জ্বল হতে পারে। এ রকম একটি সুপারনােভার অবশিষ্টাংশকেই আমরা এখন কাঁকড়া নীহারিকা (Crab nebula) নামে চিনি। চীন দেশে ১০৫৪ সালে একে দেখার কথা লেখা আছে। এ ক্ষেত্রে বিস্ফোরিত নক্ষত্রটির দূরত্ব ছিল পাঁচ হাজার আলােকবর্ষ । এর পরেও বহু মাস ধরে একে খালি চোখে দেখা গিয়েছিল । এটি এত বেশি উজ্জ্বল ছিল যে একে দিনেরবেলায়ও দেখা যেত। রাতেরবেলায় এর আলােতে বই পড়া যেত । এটি যদি এর দশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ, পাঁচশ আলােকবর্ষ দূরে থাকত তবে এটি একশ গুণ উজ্জ্বল হতাে। সে ক্ষেত্রে রাত আর দিনের মধ্যে কোনাে পার্থক্য থাকত না। এই বিস্ফোরণের তীব্রতা পৃথিবীতে আলাে প্রদানের ক্ষেত্রে সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে পারত, যদিও সূর্য এর চেয়ে কোটি কোটি গুণ কাছে। মনে আছে নিশ্চয়ই, আমাদের সূর্যের দূরত্ব কিন্তু মাত্র ৮ আলােক মিনিট । এত কাছে যদি কোনাে সুপারনােভা থাকত, পৃথিবী নিজে ঠিকই থাকত, কিন্তু বিকিরণের কারণে সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যেত।
সম্প্রতি কেউ কেউ বলেছেনও যে প্রায় ২০ লাখ বছর আগে প্লাইস্টোসিন ও প্লয়ােসিন যুগের মাঝখানে যে সামুদ্রিক প্রাণীরা মারা পড়েছিল তাতেও একটি সুপারনােভা থেকে আসা মহাজাগতিক বিকিরণের ভূমিকা ছিল। এই সুপারনােভাটি ছিল আমাদের খুব কাছেই বৃশ্চিকসেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জে (star cluster)। কিছু বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, উন্নত প্রাণের উদ্ভব ঘটে গ্যালাক্সির সেই অঞ্চলের দিকে, যেখানে তারকার সংখ্যা খুব বেশি থাকে না । একে বলা হয় জোন অব লাইফ । কারণ বেশি তারকাময় অঞ্চলে নিয়মিত সুপারনােভাদের হানায় প্রাণের বিকাশে বাধা পড়ে। মহাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে প্রতিদিন লাখ লাখ সুপারনােভা বিস্ফোরিত হয়। একটি গ্যালাক্সিতে প্রায় প্রতি শতাব্দীতে একটি করে সুপারনােভার বিস্ফোরণ ঘটে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দুর্ভাগ্য যে জানা তথ্য মতে, মিল্কিওয়েতে সর্বশেষ সুপারনােভার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৬০৪ সালে, যখনও টেলিস্কোপ আবিষ্কৃতই হয়নি ।
আমাদের গ্যালাক্সিতে পরবর্তী সুপারনােভা বিস্ফোরণ ঘটানাের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে রাে ক্যাসিওপিই নামক নক্ষত্র । ভাগ্য ভালাে যে এটি আমাদের থেকে দশ হাজার আলােকবর্ষ দূরে আছে, যা আমাদের জন্য নিরাপদ দূরত্ব । এটি একটি হলুদ হাইপারজায়ান্ট (yellow hyper giant) শ্রেণির তারকা । মিল্কিওয়েতে আবিষ্কৃত মাত্র সাতটি হলুদ হাইপারজায়ান্টের মধ্যে এটি একটি। ১৯৯৩ সালে একদল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ এটি। নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরের কয়েক বছরে তাঁরা দেখলেন, এর তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমে কয়েক শ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠা-নামা করছে। এরপর ২০০০ সালের গ্রীষ্মে এর তাপমাত্রা হঠাৎ করে সাত হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে চার হাজারে নেমে আসে। একই সময় তারা এর বায়ুমণ্ডলে টাইটেনিয়াম অক্সাইড খুঁজে পান। তাঁদের মতে, একটি প্রচণ্ড শক ওয়েভের মাধ্যমে নক্ষত্রটি থেকে এই পদার্থ বাইরের দিকে চলে এসেছে ।
নক্ষত্রের জীবনের শেষের দিকে তৈরি কিছু ভারী পদার্থ সুপারনােভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নক্ষত্র তৈরিতে এই পদার্থগুলাে ভূমিকা রাখে। আমাদের সূর্যেই এ রকম দুই শতাংশ ভারী মৌল রয়েছে। আমাদের সূর্য হলাে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র । প্রায়। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এর জন্ম। এর আগে বিস্ফোরিত সুপারনােভার ধ্বংসাবশেষের ঘূর্ণনশীল গ্যাসীয় মেঘ থেকে এর সৃষ্টি। সেই মেঘের বেশির ভাগ অংশই হয় সূর্য তৈরিতে কাজে লেগেছে অথবা আরও দূরে ছিটকে গেছে । অল্প কিছু পরিমাণ ভারী মৌল জড় হয়ে আমাদের পৃথিবীর মতাে গ্রহদের জন্ম হয়েছে, যারা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আমাদের অলঙ্কার তৈরির স্বর্ণ এবং নিউক্লিয়ার চুল্লির ইউরেনিয়াম-দুটোই সৌরজগতের জন্মের আগে কোনাে সুপারনােভা বিস্ফোরণের ফসল!
No comments
Post a Comment