পরীক্ষার নামঃ- পানির উপর উত্তাপের প্রভাব আছে—প্রমাণ কর?
উপকরণঃ- ছিপিসহ একটা ফ্লাস্ক, কাচের ফানেল, গ্রিজ, পানি, কালি বা রঙ, মােমবাতি বা বুনসেন বার্নার।
কার্যপ্রণালীঃ- প্রথমে ফ্লাস্কের ছিপির ভেতর গর্ত করে কাচের নলটি তার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করাতে হবে । ছিপির যেখান দিয়ে নলটি প্রবেশ করানাে হয়েছে, সেই জোড় মুখ যাতে এয়ারটাইট থাকে, তার জন্য গ্রিজ, অথবা গালা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এবার নলসহ কর্কটি ফ্লাস্কের মুখে বেশ শক্ত করে বসাও। পানিতে দু-এক ফোটা কালি বা তরল রঙ মেশাও। এতে পানির মাত্রা লক্ষ্য করতে সুবিধা হবে। ফ্লাস্কের পানিতে নলটি যে পর্যন্ত ডুবে আছে সেখানে একটি চিহ্ন দাও।
এখন ফ্লাস্কের নিচে মােমবাতির অথবা বুনসেন বার্নারের শিখার আগুনে ধীরে ধীরে পানি গরম করতে হবে এবং দৃষ্টি রাখতে হবে পানির সমতল রেখার দিকে। দেখা যাবে পানির সমতল রেখায় পরিবর্তন এসেছে। কি পরিবর্তন? পানি উত্তপ্ত হতেই পানির মাত্রা উপরের দিকে উঠছে।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, উত্তাপে পানির আয়তন বাড়ে। পানির অনুগুলি উত্তাপে সম্প্রসারিত হতে চায় এবং যার জন্য দরকার | অতিরিক্ত স্থানের । তাই সে ওপরের দিকে ওঠে।
পরীক্ষার নামঃ- হাতে ধরা অবস্থায় টেস্টটিউবের পানি ফোটে-তা কি সম্ভব?
উপকরণঃ- একটা অগ্নিনিরােধক টেস্টটিউব, মােমবাতি ও পানি।
কার্যপ্রণালীঃ- টেস্টটিউবের ৩/৪ ভাগ পানিতে ভর্তি করে টেস্টটিউবটি একটু কাত করে ধর (ছবিতে যেভাবে দেখানাে হয়েছে) যাতে মােমবাতির শিখায় পানির ওপরের অংশ গরম হয়। কিছুক্ষণ পর পানি ফুটতে শুরু করবে এবং বাম্পাকারে ওপরের দিকে উঠবে, তা দেখা যাবে। তুমি টেস্টটিউবটি ধরে আছ, টেস্ট টিউবের পানি ফুটছে, অথচ তােমার হাতে মােমবাতির আগুনের আঁচ লাগছে না। অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু যদি টেস্টটিউবের নিচের দিকের পানি গরম করতে শুরু কর, তাহলে কিন্তু ওপরের দিকটা হাতে ধরে রাখতে পারবে না। তা গরম হয়ে উঠবে। কেন? যদি নিচের দিক থেকে তা গরম হতে শুরু হয়, তাহলে তুমি টেস্টটিউবের কোনাে অংশই ধরে রাখতে পারবে না, কারণ গরম হলে পানি হাল্কা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে এবং নিচের ঠাণ্ডা পানি ফুটন্ত না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। গরম পানির সংস্পর্শে টিউবের পার্শ্বদেশও গরম হয়ে ওঠে। কাজেই সে অবস্থায় টেস্টটিউব ধরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু ওপরের দিক থেকে পানি গরম করতে থাকলে তা হবে না । ওপরের উত্তপ্ত পানি নিচের দিকে নামার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ ওপরের গরম পানি হাক্কা। বরং উত্তপ্ত পানি, বাষ্প হয়ে ওপরে উঠতে থাকবে এবং নিচের পানি উত্তাপের কোনাে প্রভাব পড়বে না, যার জন্য তােমার পক্ষে টেস্টটিউবের নিচের অংশ ধরে রাখা মােটেই অসম্ভব হবে না।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, টেস্টটিউবের একদিকে কাত করে পানি হাতে ধরে রেখেও পানি ফুটানাে সম্ভব।
পরীক্ষার নামঃ- বিজ্ঞানী গ্যালিলিও পিসার হেলানাে টাওয়ার থেকে কয়েক টুকরাে পাথর ফেলে প্রমাণ করেছিলেন যে, ওজনের তারতম্য সত্ত্বেও সবকটি পাথর একই সঙ্গে ভূমিতে পড়েছে। কিভাবে সম্ভব?
উপকরণঃ- এক মিটার লম্বা একটা কাঠের তক্তা আর বিভিন্ন ওজনের কিছু কয়েন।
কার্যপ্রণালীঃ- তক্তার লম্বা বরাবর কয়েনগুলাে সারিবদ্ধভাবে রেখে তক্তাটি সমান্তরালভাবে দু'হাত দিয়ে ধরে মাথার ওপরে রাখ। তক্তা ও জমির দূরত্ব। বাড়াতে তুমি কোনাে টুলের উপরও দাঁড়াতে পার। এখন তক্তাটা এমনভাবে কাত করাে যাতে কয়েনগুলাে একই সঙ্গে গড়িয়ে পড়ে। ফেলার আগে বন্ধুকে বলে রাখ, সে যেন ভালাে করে লক্ষ্য করে, সব কয়েন একই সঙ্গে মাটিতে পড়েছে কিনা। কয়েনগুলাে যাতে এক সঙ্গে পড়ে, এমনভাবে তুমি যদি তক্তাটি কাত কর, তাহলে দেখবে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে সবকটি কয়েনই একসঙ্গে মাটি স্পর্শ করেছে। মাধ্যাকর্ষণের নিয়মানুষারে সবকিছুই একই গতিতে ভূ-কেন্দ্রাভিমুখী হয়। কিন্তু এই পরীক্ষাই যদি একটি কয়েন এবং একটি পালক বা কাগজ নিয়ে করা হয়, তাহলে ফল অবশ্য অন্য হবে। কয়েন ভূমি স্পর্শ করবে আগে এবং কাগজ বা পালক পরে। কেন? কারণ বাতাস কাগজটিরে পড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু কাগজটি যদি কয়েনের ওপর রেখে ফেলা যায়, তাহলে উভয়ই একসঙ্গে মাটিতে পড়বে। যেহেতু বাতাস কাগজটিকে মাটিতে পড়ার পথে। সরাসরি কোনাে বাধা সৃষ্টি করছে না।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, প্রখ্যাত ইতালিয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও পিসার হেলানাে টাওয়ার থেকে কয়েক টুকরাে পাথর ফেলে প্রমাণ করেছিলেন যে, ওজনের তারতম্য সত্ত্বেও সবকটি পাথর একই সঙ্গে ভূমিতে পড়েছে—তা সত্য।
পরীক্ষার নামঃ- আমরা যে খাদ্য খাই তাতে শর্করা এবং চর্বিজাতীয় উপাদান থাকে, কোন খাদ্যে কোন উপাদান আছে তা নির্ধারণের কি কোনাে সহজ উপায় আছে?
উপকরণঃ- স্টার্চ বা শর্করা, বেকিং পাউডার (সােডিয়াম বাই-কার্বনেট), ড্রপার, টিংচার আয়ােডিন। আর চর্বিজাতীয় উপাদান প্রমাণের জন্য প্রয়ােজন- এক টুকরাে পরিষ্কার কাগজ, লেবুর রস, ঘি বা মাখন।
কার্যপ্রণালীঃ- এক টুকরাে কাচের ওপর একটু স্টার্চ বা শর্করা নাও এবং কাচের একটু তফাতে নাও বেকিং পাউডার। এবার ড্রপারের সাহায্যে দুটি উপাদানের ওপর এক ফোঁটা করে টিংচার আয়ােডিন ফেলতে হবে। এবার লক্ষ্য করতে হবে রঙের পরিবর্তন। সােডিয়াম বাই-কার্বনেট ধারণ করবে আয়ােডিনের রঙ এবং স্টার্চ নেবে বেগুনি-লাল, যার দ্বারা বােঝা যাবে তাতে স্টার্চ আছে। এখন এক টুকরাে আলু আপেল ও পাউরুটি নিয়ে তাতে ফোটায় ফোঁটায় টিংচার আয়ােডিন ফেলতে হবে। দেখবে, আপেল ছাড়া পাউরুটি ও আলুর রঙ হয়ে বেগুনি-লাল, যার দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে এতে স্টার্চ বা শ্বেতসার আছে। | এবার প্রমাণ করতে হবে খাবারে চর্বির উপাদান। এক টুকরাে পরিষ্কার কাগজ নিয়ে পাশাপাশি দুটি বৃত্ত এঁকে, একটি বৃত্তে ফেল কয়েক ফোঁটা লেবুর রস এবং অন্য বৃত্তে ঘি বা মাখন। ১০-১৫ মিনিট পরে দেখবে, যেখানে লেবুর রস ফেলা হয়েছে, সেই অংশটি শুকিয়ে গেছে এবং কাগজের পেছন দিকে তার কোনাে দাগ নেই। কিন্তু যে অংশটিতে ঘি বা মাখন রাখা হয়েছিল, সেই অংশের দাগ খুব স্পষ্ট, শুধু সামনের দিকেই নয়, পেছনের দিকেও এবং দাগের পরিধিও বিস্তৃত। এই পরীক্ষায় প্রমাণিত হলাে যে, চর্বি জাতীয় পদার্থের ছাপ শুধু যে বিপরীত দিক থেকেই দেখা যায়, তা নয় সেই ছাপ ছড়িয়ে পড়ে। এই পরীক্ষাকে বলে স্পট টেস্ট ফর ফ্যাট।
ফলাফলঃ- উপরের দুটি পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, কোন খাবারে শর্করা এবং কোন খাবারে চর্বিজাতীয় উপাদান আছে তা সহজে নির্ধারণ করা যায় ।
পরীক্ষার নামঃ- নদীর পানি যাতে উপচে পড়ে বন্যার সৃষ্টি না করে সেজন্য বাঁধ দেয়া হয় কিন্তু এই বাঁধের নিচের দিকটা ওপরের অংশের তুলনায় অনেক বেশি চওড়া করে দেয়া হয় কেন?
উপকরণঃ- একটা সরু লম্বা টিনের পাত্র, হাতুড়ি, পেরেক, পানি।
কার্যপ্রণালীঃ- লম্বা টিনের পাত্রের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চারটি সমান অংশে ভাগ করে, হাতুড়ি ও পেরেকের সাহায্যে তিনটি ছিদ্র করাে। পাত্রটি ট্রে কিংবা এমন জায়গায় রাখ, যাতে পানি পড়ে কোনাে কিছু নষ্ট না হয়। এবার টিনের পাত্রটি পানিতে ভর্তি কর। কি হচ্ছে? দেখা যাচ্ছে তিনটি ছিদ্র দিয়ে পানি তিনটি ধারায় পড়ছে। কিন্তু এও দেখবে যে, তিনটি পানির ধারা সমান দূরত্বে পড়ছে না। নিচের ছিদ্র দিয়ে নির্গত পানি সব থেকে দূরে পড়ছে এবং ওপরের ছিদ্র পথে নির্গত পানি পড়ছে টিনের সব থেকে কাছে! এর কারণ কি? কারণটা হচ্ছে, ওপরের ছিদ্র মুখের ওপরে যে পানি আছে, সেই পানিই কেবল ওপরের ছিদ্রমুখ দিয়ে নির্গত হচ্ছে। যেহেতু নিচের অংশের পানি ওই পর্যন্ত পৌছাচ্ছে না, সেহেতু ওই ছিদ্রমুখে নিচের পানির অংশে কোনাে চাপ পড়ছে না। তেমনি, নিচের ছিদ্রমুখের ওপর পড়ছে ওপরে সমগ্র অংশের পানির চাপ এবং স্বভাবতই ওপরের ছিদ্রমুখ থেকে নিচের ছিদ্রমুখের ওপর চাপ অনেক বেশি হবে। বেশি চাপের দরুণ নিচের ছিদ্রমুখ থেকে নির্গত পানির ধারা দূরে গিয়ে পড়ছে। এ কারণে নদীতে নির্মিত বাঁধের তলদেশ অনেক বেশি চওড়া হয়, কারণ তলদেশের ওপর পানির চাপ অনেক বেশি পড়ে।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, কি কারণে নদীতে যে বাঁধ দেয়া হয় তার উপরের দিকের চেয়ে নিচের অংশটা চওড়া বেশি থাকে।
পরীক্ষার নামঃ- থেমে থাকা বাস বা গাড়ি হঠাৎ চলতে শুরু করলে ভেতরে বসা ব্যক্তি পেছনের দিকে হেলে পড়ে-কেন?
উপকরণঃ- একটা কাচের গ্লাস, একখণ্ড পিচবাের্ড, একটা এক টাকার কয়েন।
কার্যপ্রণালীঃ- কাচের গ্লাসের ওপর একখণ্ড পিচবাের্ড রাখ এবং তার ওপরে রাখতে হবে একটা কয়েন। আঙুল দিয়ে পিচবাের্ডের খণ্ডটি ফেলে দাও, দেখবে পিচবাের্ডের সঙ্গে কয়েনটিও মাটিতে পড়ে গেছে। কয়েনসহ পিচবাের্ডটি আবার গ্লাসের ওপর রাখ। এবার তর্জনী ও বুড়াে আঙুলের সাহায্যে পিচবাের্ডের কিনারায় খুব জোরে টোকা মার। এ ক্ষেত্রে কিন্তু ফল অন্যরকম হবে । জোরে টোকা মারার সঙ্গে সঙ্গে পিচবাের্ড ছিটকে গ্লাসের বাইরে পড়েছে, কিন্তু কয়েনটি পড়েছে গ্লাসের ভেতর। আসল ব্যাপার হলাে, সজোরে টোকা মারার কারণে পিচবাের্ডের টুকরাে যে গতিতে ছিটকে গেছে, তার ওপর রাখা মুদ্রাটি সেই গতিতে যেতে পারেনি এবং পিচবাের্ডের গতির সঙ্গে যেতে পারার পেছনে কাজ করেছে ল অব ইন্যার্সিয়া'। নিশ্চল কোনাে বস্তু সেই অবস্থাতেই থাকবে, যতক্ষণ না বাইরের কোনাে শক্তি তাকে চালিত করছে। ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, ‘ল অব ইন্যার্সিয়া শক্তির কারণে এখানেও চলন্ত বাস বা গাড়ি হঠাৎ দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করলে ভেতরের যাত্রীরা পেছন দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
পরীক্ষার নামঃ- দ্রুতগামী বাস বা গাড়ির গতি হঠাৎ কমলে বা থামলে ভেতরে বসা ব্যক্তি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে—কেন?
উপকরণঃ- শুধুমাত্র কয়েকটা বই লাগবে এ পরীক্ষার জন্য।
কার্যপ্রণালীঃ- হাতের ওপর প্রসারিত করে তার ওপর ৬-৭টি বই রাখ, একটার ওপর একটা। এবার কিছুটা সামনে হাত বাড়িয়ে দ্রুত হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড় । কি হচ্ছে? হাতের উপর রাখা বই থেকে কয়েকটা বই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। এ পরীক্ষা তুমি যতবার করবে ততবারই একই ফল হবে। অন্যদিকে চলন্ত বাস বা গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলে বা গাড়ি থামালে ভেতরে বসা যাত্রীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়। এখানে ল অব ইন্যার্সিয়া কার্যকর। এই নিয়ম অনুসারে, কোনাে পদার্থ বাধা না পেলে জড়তার নিয়মানুষারে বিদ্যমান থাকে, বা এক দিশায় চলতে থাকে।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, ‘ল অব ইন্যার্সিয়া শক্তির কারণে চলন্ত বাস বা গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলে ভেতরের যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে।
পরীক্ষার নামঃ- সার্কাসে মরণ ফাঁদ’ নামে একটা মােটর সাইকেলের খেলা দেখানাে হয়। চালক গােলাকার খাঁচার ভেতরে খুব দ্রুতগতিতে মােটর সাইকেল চালায় কিন্তু পড়ে যায় না, এমন কি খাড়াখাড়ি চালানাে সত্ত্বেও পড়ে যায় না-কেন?
উপকরণঃ- একটা ছােট বালতি, পানি, রসি বা দড়ি একটা শক্ত টুল।
কার্যপ্রণালীঃ- ছােট বালতির এক-তৃতীয়াংশ পানি ভর্তি করে তার হাতলে আধা মিটার লম্বা দড়ি বাঁধতে হবে। এবার খােলা জায়গায়, কাঠের টুলের উপর দাঁড়িয়ে বালতির হাতলের দড়ি ধরে খুব জোরে চক্রাকারে ঘােরাতে থাক। ঘােরানাের সময় দেখবে যাতে বালতির মুখের দিকটা তােমার হাতের দিকে থাকে এবং পেছন দিকটা থাকে বৃত্তের বাইরের দিকে। ঘােরাতে-ঘােরাতে এমন একটা অবস্থা আসবে, যখন বালতির মুখ থাকবে খাড়াভাবে তােমার দিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বালতির পানি পড়বে না। যে শক্তি বালতির পানি পড়তে দিচ্ছে না, সেটাকে বলে কেন্দ্রমুখি বা অপকেন্দ্র বল বলে । অপকেন্দ্র বলের প্রধান ধর্ম হলাে, চক্রাকার পথে আবর্তিতত তীব্র গতিশীল কোনাে বস্তু এবং বৃত্তাকারআবর্তনের কেন্দ্রের মধ্যে গতি যত বেশি হবে, অপকেন্দ্র বলও তত বাড়বে। এই অপকেন্দ্র বলের দরুণ, মােটরসাইকেল চালক, খাচার ভেতরে চালাবার সময় মােটর সাইকেলসহ নিজে পড়ে যায় না।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, সেন্ট্রিফিউগল ফোর্স বা অপকেন্দ্র বলের দরুণ বালতির পানি পড়ে যায় না আর সার্কাসের খেলায় গােলাকার কিংবা খাড়াখাড়ি চালালেও মােটরসাইকেল চালকও পড়ে যায় না।
পরীক্ষার নামঃ- স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতার মাঝের অবস্থা হচ্ছে ঈষদচ্ছ, অর্থাৎ আলােকরশ্মি দ্বারা ভেদ্য হলেও স্বচ্ছ নয়। দ্রবনীয়তা ও অদ্রবনীয়তার মধ্যেও কি এমন অবস্থা আছে?
উপকরণঃ- মােটা কাগজ, টর্চ লাইট, দুটি কাচের বােতল, পানি, চিনি ও দুধ।
কার্যপ্রণালীঃ- মােটা কাগজটি মােচাকারে ভাঁজ করে এর ছুঁচালাে মাথাটা সামান্য কেটে দিতে হবে। এবার মােচাকৃতি কাগজের খােলটি টর্চ বা আলাের সামনে আঠা দিয়ে আটকে দাও। রঙহীন দুটি কাচের বােতলে পানি ভর্তি করে একটিতে কয়েক চামচ চিনি এবং অন্যটিতে কয়েক চামচ দুধ দিতে হবে। চিনি পানিতে শুলে যাবার পর, এক এক করে উভয় বােতলেই টর্চের আলাে ফেল। দেখা যাবে, যে বােতলে চিনি দেয়া ছিল, আলাে সেই বােতলে কোনােক্রমে অতিক্রম করছে। কিন্তু যে বােতলে দুধ দেয়া ছিল সেটা খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কারণ দুধ পানির সঙ্গে কলয়ডাল মিশ্রণ (আঠার মিশ্রণ) সৃষ্টি করেছে। যখন কোনাে পদার্থ পানি বা কোনাে তরল পদার্থের সঙ্গে মেশে, তখন সমগ্র পদার্থ বা তার অংশবিশেষ তরল পদার্থে গলে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ধর্মকে বলে তরল পদার্থের দ্রবনীয়তা। যদি তা না গলে, তাহলে তাকে বলা হয় অদ্রবনীয়তা সেক্ষেত্রে সেই পদার্থ তরল পদার্থের তলানী হিসেবে জমা হয়। এই দুই অবস্থা ছাড়া আরাে একটা অবস্থা আছে, যাকে বলা হয় কলয়ডাল সাসপেনসন, অর্থাৎ যা গলে না এবং নিচেও জমা হয় না। এর মলিকিউলস ঝুলে থাকে। এসব মলিকিউল বড় বলে তাতে আলাে প্রতিফলিত হয়ে তা দেখা যায়। এখন নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ, দুধ মেশানাে পানি কেন চকচকে উজ্জ্বল হয়, যখন তার মধ্যে দিয়ে আলাে অতিক্রম করানাে হয়।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলাে, দ্রবনীয় ও অ-দ্রবনীয় অবস্থা ছাড়াও একটা অবস্থা আছে, যাকে বলে কলয়ডাল সাসপেনশন, অর্থাৎ যা গলে না এবং পাত্রের নিচেও জমা হয় না। এর মলিকিউলসগুলাে ঝুলে থাকে।
পরীক্ষার নামঃ- সরাসরি আলাের নিচে রাখা পানিতে কয়েক ফোঁটা দুধ ফেললে তা উজ্জ্বল চকচকে হয়ে ওঠে কেন?
উপকরণঃ- বড় মুখের একটি বােতল বা কাচের জার, টর্চ লাইট, পানি ও দুধ।
কার্যপ্রণালীঃ- প্রথমে বােতল বা কাচের জারে পানি ভর্তি করতে হবে। এবার টর্চ লাইটের আলাে তার ওপর এমনভাবে ফেলতে হবে, যাতে আলাে সরাসরি পানির ওপর পড়ে, বােতল বা জারে নয়। এখন যদি ওপর থেকে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে পানি চকচক করছে, কিন্তু বােতলের বাইরের দিকটা দেখা যাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার। এবার সেই পানিতে মেশাতে হবে ২-৩ চামচ দুধ। ভালাে করে চামচ দিয়ে নেড়ে দিতে হবে। এখন তার ওপর আলাে ফেললে দেখা যাবে অনেক তফাৎ। বােতলের ভেতরকার উজ্জ্বলতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বােতলের বাইরের দিকের উজ্জ্বলতা বেড়েছে অনেক গুণ বেশি–ঠিক যেন এক দুধেলা বালবের মতাে দেখাচ্ছে। যা ঘটছে তা হলাে, টর্চের আলাে ফেললে, আলাের আপতন কোণ এত তীব্র হয় যে, সম্পূর্ণ প্রতিফলন, নিয়মানুসারে সমগ্র আলাে জারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পানির সঙ্গে যখন একটু দুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়, তখন অবস্থার আমূল রূপান্তর ঘটে। টর্চের আলাে, পানির ওপর ভাসমান দুধের মলিকিউলসের ওপর পড়তেই তা প্রতিফলিত হয় । প্রতিফলিত আলাে বােতলের স্বচ্ছ দেয়াল ভেদ করে ভেতরের উজ্জ্বলতা বাইরে নিয়ে আসে।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষার মাধ্যমে এখন একেবারে স্পষ্ট যে, সরাসরি আলাের নিচে রাখা পানিতে কয়েক ফোঁটা দুধ ফেললে তা উজ্জ্বল ও চকচকে হয়ে ওঠে।
পরীক্ষার নামঃ- এক গ্লাস পানিতে একটি পাস্টিক বা কাচের টিউব রাখলে টিউবের পানির মাত্রা গ্লাসের পানির মাত্রার চেয়ে উপরে থাকে—কেন?
উপকরণঃ- পানি ভরতি একটা কাচের গ্লাস, ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসের তিন-চারটি কাচের টিউব
কার্যপ্রণালীঃ- পানি ভরতি গ্লাসে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসের তিন-চারটি টিউব রাখতে হবে । কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসের টিউবে পানির মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন রকম, অথচ গ্লাসের পানি আছে স্থির। যে টিউবের ব্যাস সব থেকে ছােট, সেই টিউবের পানির মাত্রা সবথেকে ওপরে এবং যে টিউবের ব্যাস সব থেকে বড় সেই টিউবের পানির মাত্রা সবথেকে নিচে। কেন এমনটা হয়? নিচের পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তর পাওয়া যাবে। | একটা টেস্টটিউবের অথবা লম্বা, সরু ও গােলাকার বােতল নিয়ে অর্ধেকটা ভর্তি কর পানিতে। এবার মনোেযােগ দিয়ে পানির মাত্রা লক্ষ্য কর। পাশের দিকে পানির লেবেল ওপরে কিন্তু মাঝখানটার লেবেল হয়েছে অবতল বা ধনুতের মতাে বাঁকা। পানির এই বাঁকা রেখাকে বলে মেনিসকাস। আসঞ্জন ধর্মের (লেগে থাকা) দরুন টিউব বা বােতলের দেয়ালে পানির কিছু অংশের ওপর যে আকর্ষণ শক্তি প্রয়ােগ করে তার ফলেই ধনুকের মতাে এই রেখা সৃষ্টি হয়।
সাধারণভাবে তুমি মনে করতে পার, এই আসঞ্জন শক্তির ফলেই টিউবের পার্শ্বদেশে পানির মাত্রা উর্ধ্বমুখী হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পানির মাত্রা উর্ধ্বমুখী হওয়ার এই ক্রিয়াকে বলে ক্যাপিলাবি অ্যাকশন’ কৈশিক প্রভাব। কম ব্যাসের টিউবের কৈশিক ক্ষমতা সব থেকে বেশি, কারণ কম ব্যাসের টিউবে পানির বৃহত্তর অংশ টিউবের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকে, যার ফলে আকর্ষণ শক্তির প্রভাব বেশি হয়। | এখন দেখা যাক, পানিতে ভর্তি করার আগে টিউবের ভেতরের দিকে গ্রিস মাখালে কী হয়। এবার দেখা যাবে পানির মাত্রা ধনুকের মতাে নিচের দিকে না বেঁকে, ওপর দিকে ফুলে উঠেছে। কেন? এর কারণ হলাে, প্লাস্টিক বা গ্লাসের মতাে গ্রিস অত জোরে পানির মলিকিউলগুলাে আকর্ষণ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে, পানির মলিকিউলগুলাের পারস্পরিক আকর্ষণ । গ্রিসের চেয়ে বেশি, যাকে বলা হয় ‘কোহিজন' (যে শক্তি বলে অনুগুলাে পরস্পর একত্রিত থাকে) অ্যাডিজন' নয় ।
ফলাফলঃ- অতএব, প্রমাণিত হলাে ক্যাপিলাবি অ্যাকশন বা কৈশিক প্রভাবের ফলে গ্লাসের ভেতর রাখা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসের টিউবের পানির মাত্রা গ্লাসের পানির মাত্রা থেকে ওপরে থাকবে।
পরীক্ষার নামঃ- কিছু কিছু কীট-পতঙ্গ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে পানির ওপর চলাফেরা করে। পানির মতাে তরল পদার্থের ওপর কিভাবে তা সম্ভব হচ্ছে?
উপকরণঃ- পানি ভর্তি একটা বড় পাত্র, এক টুকরাে টিসু পেপার, একটা সঁচ।
কার্যপ্রণালীঃ- টেবিলের ওপর পানি ভর্তি বড় পাত্রের পানি স্থির হলে, খুব সাবধানে পানির ওপর সমান্তরালভাবে একটা সুঁচ রাখ। যদি ঠিকমতাে রাখতে পার, তাহলে দেখে অবাক হবে যে উঁচ পানিতে ভেসে আছে । যদি ডুবে যায়, তাহলে নিরাশ না হয়ে আবার চেষ্টা কর। সফল হবেই। এবার অন্য একটা পরীক্ষা করে দেখা যাক, এক টুকরাে টিসু পেপার পানির ওপর রেখে তার ওপর সঁচটি রাখতে হবে। পানিতে ভিজে টিপেপার কিছুক্ষণ পর ডুবে যাবে কিন্তু সুঁচ ভেসে থাকবে। কারণ কি? আসলে, পানির ওপরটায় একটা মিহি আস্তরণ থাকে, যাকে বলে সারফেস্ টেনশন' বা উপরিভাগের টান। পানির উপরিভাগের মলিকিউল গুলি নিচের মলিকিউলের তুলনায় আরাে ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এভাবে পানির উপরিভাগের মলিকিউলগুলির মধ্যে তীব্র আকর্ষণ শক্তি উঁচটিকে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। এই তীব্র আকর্ষণ শক্তি পানির ওপর তৈরি করে এক ধরনের আস্তরণ, যা প্লাটফর্মের মতাে কাজ করে। আর এরই ওপর দিয়ে ছােট ছােট কীট-পতঙ্গ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করে।
ফলাফলঃ- পানির উপরিভাগে যে আস্তরণ ও উপরিভাগের যে টান থাকে তার উপর ভর করে অনেক জলজ কীট-পতঙ্গ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে।
পরীক্ষার নামঃ- শীত প্রধান অঞ্চলে নদী, সাগর ইত্যাদি জমে বরফ হয়ে যায়। এই বরফের ওপরে মানুষ এক বিশেষ ধরনের জুতা, যাকে বলে আইস স্কেটস, পরে স্কেটিং খেলে। আইস স্কেটিং কীভাবে খেলা যায়?
উপকরণঃ- লম্বা একটা ধাতু নির্মিত তার, দুটো পেনসিল।
কার্যপ্রণালীঃ- ধাতু নির্মিত তারের উভয় প্রান্তেই একটি করে পেন্সিল বাঁধ । পেন্সিল দুটি তারকে আঁটো করে রাখতে হ্যান্ডেলের মতাে কাজ করবে। এখন একটি ছােট কাঠের তক্তার ওপর বড় একখণ্ড বরফ এমনভাবে রাখ যাতে পেন্সিল দুটি তক্তার উভয় দিকে ঝুলন্ত থাকে। এবার দু'হাত দিয়ে দু’দিকের পেন্সিল ধরে ধীরে ধীরে নিচের দিকে টানতে থাক। কী ঘটছে। | দেখা যাবে, তার বরফ কেটে নিচের দিকে নামতে থাকবে এবং বরফ ভেদ করে শেষ পর্যন্ত গােড়া পর্যন্ত পৌছে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বরফ দু'টুকরাে হবে না। তারের ঘর্ষণজনিত তাপে বরফ গলে যাবে, তার ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে, কিন্তু পরমুহূর্তে কাটা অংশ আবার জমে বরফ হয়ে যাবে। আসল কাজটা বােঝা গেছে নিশ্চয়। হ্যা, তারের চাপে তাপ উৎপন্ন হচ্ছে এবং সেই তাপে বরফ গলছে। চাপ সরে যেতে তাপও অপসারিত হচ্ছে। ফলে বরফের বিভক্ত অংশ জোড়া লেগে যাচ্ছে। আইস-স্কেটিং গেমসে, খেলােয়াড়ের দেহের সমগ্র ওজন কেন্দ্রীভূত থাকে, তার পায়ে বাঁধা বিশেষ ধরনের জুতাের নিচের লৌহখণ্ডের ওপর। দেহের ভারজনিত চাপে লৌহখণ্ড বরফের ওপর উৎপন্ন করে তাপ এবং সেই তাপে বরফ গলে । গলা বরফ থেকে তৈরি হয় পানি। সেই পানিতে বরফের বুক হয় পিচ্ছিল যা স্কেটারকে গড়িয়ে যেতে সাহায্য করে ।
ফলাফলঃ- উপরের পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হলাে, বরফের ভেতর কীভাবে আইস স্কেটিং খেলা যায়।
পরীক্ষার নামঃ-বর্ষার সময় আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি হয়, কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। কোথা থেকে এত বৃষ্টি আসে?
উপকরণঃ- একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি, একটা হাতাওয়ালা প্যান বা কড়াই,কয়েক টুকরাে বরফ অথবা ঠাণ্ডা পানি।
কার্যপ্রণালীঃ- অ্যালুমিনিয়ামের কেটলিতে পানি ফোটাতে হবে। বাষ্প নির্গত না হওয়া পর্যন্ত পানি ফোটাতে হবে। এবার হাতাওয়ালা প্যানে কিছু বরফের টুকরাে বা ঠাণ্ডা পানি নাও।এখন বুঝতে পারবে বৃষ্টির পানি আসে কোথা থেকে। এবার কেটিলির যে মুখ থেকে বাষ্প বেরােচ্ছে, তার একটু দূরে ধর বরফ ভর্তি ওই প্যান। প্রচুর বাষ্প প্যানের শীতল গায়ে আঘাত খেয়ে পুনরায় পানিকণায় পরিণত হবে, অর্থাৎ ঘনীভবন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির বিন্দু একত্রিত হয়ে যখন বড় ফোটায় পরিণত হয়, তখন নিজের ভারেই তা ঝরে পড়ে। এই প্রক্রিয়াতেই বৃষ্টি হয়।
সূর্যের তাপে নদী, সাগর, হ্রদ ও পুকুরের পানি বাষ্পকারে আবহমণ্ডলে মিশে যায়। বাতাস যখন ওপরের দিকে ওঠে তখন তা ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং বাতাসে সঞ্চিত বাষ্প উধ্বাকাশের শীতল আবহাওয়ার সংস্পর্শে পানির কণায় পরিণত হয়ে মেঘের সঞ্চার করে। পানির বিন্দুগুলি যখন বেশি ভারি হয়, তখন নিজের ভারেই বৃষ্টি হয়ে অঝােরে পৃথিবীতে ঝরে পড়ে।
ফলাফলঃ- বর্ষাকালে সূর্যের তাপে নদী, সাগর, খাল-বিলের পানি বাষ্পকারে আবহমণ্ডলে মিশে গিয়ে মেঘ সৃষ্টি হয়। মেঘ হচ্ছে ছােট ছােট পানির কণা। অনেকগুলাে পানির কণা একসাথে হলে পানির কণা ভারি হয়ে যায় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঝােরে বৃষ্টি হয়।
পরীক্ষার নামঃ- গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি বা কোলড্রিংস ঢালার পর গ্লাসের গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি জমে? যতই সাবধানে ঢালাে না কেন পানি জমবেই। কারণ কি?
উপকরণঃ- অর্ধেক পানিতে ভর্তি একটা কাচের গ্লাস, কয়েক টুকরাে বরফ।
কার্যপ্রণালীঃ-পানি ভর্তি কাচের গ্লাসে বরফের টুকরােগুলাে ছেড়ে দাও। কিছুক্ষণ পর বরফ গলে যাবে এবং পানি ও গ্লাস ঠাণ্ডা হতে থাকবে। এবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে দেখা যাবে, গ্লাসের বাইরে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে । কোথা থেকে এই পানি এসে গ্লাসের বাইরের গায়ে জমা হচ্ছে? শুধু তাই নয়, দেখবে বাইরের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যত উষ্ণতর হবে, গ্লাসের গায়ে পানি জমবে তত দ্রুত এবং তা সংখ্যায় বেশি হবে। আগের পরীক্ষায় দেখেছ, বাষ্পীভবন কিভাবে হয় । উন্মুক্ত সব পানির উপরিভাগের বাষ্পীভবন একই প্রক্রিয়ায় হয়। পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে আবহমণ্ডলের সাথে মিশে যায়। কিন্তু ঠাণ্ডার সংস্পর্শে এলে আবার তা তরলে পরিণত হয়—এক্ষেত্রে যেমন পানির কণা। এই প্রক্রিয়াকে বলে ঘণীভবন ।
ফলাফলঃ- তাপমাত্রা বাড়লে, বাষ্পীভবন দ্রুত হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মাধ্যমে যত ঠাণ্ডা হবে, ঘণীভবন তত দ্রুত হবে ।
পরীক্ষার নামঃ- বাস্পীভবনের ওপর প্রচণ্ড বাতাস এবং তাপের প্রতিক্রিয়া কি?
উপকরণ- এক টুকরাে কাপড়, একটা শ্লেট।
কার্যপ্রণালী-বাষ্পীভবনের ওপর প্রচণ্ড বাতাসের প্রতিক্রিয়া দেখতে একটা ছােট পরীক্ষার প্রয়ােজন।
ভেজা কাপড় দিয়ে শ্লেটের উভয় দিকটা মুছে নাও। এখন শ্লেটের একটা দিকে জোরে জোরে ফু দাও। অথবা ফ্যানের বাতাসেও রাখা যেতে পারে।
এবার বল, কোন দিকটা আগে শুকাবে? যে দিকটায় বাতাস লাগবে সে দিকটা, না তার অপর দিকটা? হ্যাঁ, যে দিকটায় বাতাস লাগছে, সে-দিকটাই প্রথমে শুকাবে।
দমকা হাওয়ায় পানির কণাগুলাে উবে যায়। পানির কণা বা মলিকিউলগুলি উবে গেলে পরের মলিকিউলের উবে যাওয়ার পথও খুলে যায়। অন্যদিকে বাষ্পীভবনের ওপর তাপের প্রভাব পরীক্ষা করার জন্য দরকার সম আয়তনের দুটি ভােয়ালে। দুটি তােয়ালেই পানিতে ভিজিয়ে দাও, যাতে প্রায় সম পরিমাণ পানি শােষণ করতে পারে। এরপর একটা শুকোতে দাও রােদে এবং অপরটা ছায়ায়। পরীক্ষাটা এমন দিনে করবে, যখন জোরে বাতাস বইবে না। এখন দেখ, কোন্ তােয়ালে প্রথমে শুকায়।
অবশ্যই রােদে রাখা তােয়ালে প্রথমে শুকিয়ে যাবে। ঠাণ্ডা বাতাসের তুলনায় গরম বাতাসে পানির কণাগুলাে দ্রুত অপসৃত হয়। কারণ গরম বাতাসের মলিকিউলস্, ঠাণ্ডা বাতাসের চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন।
ফলাফল- বাষ্পীভবনের ওপর বাতাসের এবং তাপের দুটোরই প্রভাব রয়েছে।
পরীক্ষার নামঃ- ঠাণ্ডা পানি ভারী হয়, কিন্তু বরফ যা ঠাণ্ডা পানিরই আরেক রূপ—সেই বরফ পানিতে ভাসে কেন?
পানি ঠাণ্ডা হলে তার আয়তন কমে যায় এবং ভারী হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা পর্যন্ত চলে এবং সেটা হলাে ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট পর্যন্ত। এই তাপমাত্রায় পানির ঘনত্ব সর্বোচ্চ হয় এবং আয়তন হয় সর্বনিম। পানি যখন বরফের আকার নেয়, তখন তার আয়তন বাড়ে, অর্থাৎ এই অবস্থায় বেশি জায়গা নেয়। অবশ্য পানি বরফে পরিণত হলে তার ভর অপরিবর্তিত থাকে। কোনাে কিছুই যুক্ত বা বিযুক্ত করা হচ্ছে না। কাজেই স্পষ্টতঃই আয়তন বাড়লেও ভর অপরিবর্তিত থাকছে। এর অর্থ পানি যখন বরফে পরিণত হচ্ছে, এর ঘনত্ব তখন কমে যাচ্ছে। পানির ঘনত্ব থেকে বরফের ঘনত্ব কম তাই পানিতে ভাসবে। যেহেতু, কাঠ,কর্ক ইত্যাদির মতাে বরফের ঘনত্ব পানির ঘনত্ব থেকে কম, সেহেতু তা পানিতে ভাসে। এই বৈশিষ্ট্যের সুবিধা অসুবিধা উভয় দিকই আছে। শীত প্রধান দেশে, তাপমাত্রা খুব কমে যায় বলে নদীর পানি জমে যায়। বস্তুতঃ নদীর পানির ওপরের অংশই জমে যায়, নিচের দিকে পানি তরল অবস্থাতেই থাকে এবং থাকে বলেই পানির নিচে উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে থাকে। অন্যদিকে, সদ্র ভ্রমণকারীদের পক্ষে হিমশৈলের বেশির ভাগই পানির নিচে থাকে। জাহাজের ওপর দিয়ে গেলে এই হিমশৈলে ধাক্কা খেয়ে জাহাজ ডুবে যেতে বা অচল হয়ে যেতে পারে।
পরীক্ষার নামঃ-গােসলের পর গায়ে বাতাস লাগলে আমরা ঠাণ্ডা বােধ করি কেন?
কার্যপ্রণালী- এক টুকরাে তুলাে পানিতে ভিজিয়ে হাতের তালুর উল্টোদিকে ধীরে ধীরে ঘষা হয় তাহলে স্থানটা ভিজে যাবে এবং কয়েক সেকেন্ড বাদেই ওই স্থানটায় ঠাণ্ডা অনুভূত হবে। কেন? কারণ আগেই আমরা বাপীভবনের কথা জেনেছি। তরল পদার্থ তার সংস্পর্শে আসা যে কোনাে বস্তু থেকে তাপ সংগ্রহ করে। কাজেই, হাতের ভেজা অংশের বাস্পীভবন দেহের ওই অংশের তাপে হচ্ছে। ফলে ওই অংশের তাপ কমে যাচ্ছে এবং ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। | এখন পানির বদলে স্পিরিটে ভেজানাে সামান্য তুলাে হাতে লেপন করলে পার্থক্যটা বােঝা যাবে। পার্থক্যটা হলাে, তুমি ওই স্থানে আরাে বেশি ঠাণ্ডা অনুভব করবে। কারণ পানির চেয়ে স্পিরিটের বাষ্পীভবন বেশি তাড়াতাড়ি হয়," যার জন্য তাপও তাড়াতাড়ি দরকার হয়। ফলে ওই স্থানে আগের তুলনায় বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হয়।
এখন নিশ্চয় বােঝা যাচ্ছে, গােসলের পর আমরা ঠাণ্ডা অনুভব করি কেন। ভেজা দেহে স্বাভাবিক নিয়মে বাস্পীভবন হয় । কিন্তু বাতাসের সংস্পর্শে এলে বাষ্পীভবনের গতি দ্রুততর হয়, যার ফলে দেহের উপরিভাগের তাপমাত্রা হ্রাস পায় এবং আমারা ঠাণ্ডা অনুভব করি।
ফলাফল- বাষ্পীভবনের কারণেই গােসলের পর আমরা ঠাণ্ডা অনুভব করি।
পরীক্ষার নামঃ- বাষ্পীভবন যে হয়—তা কীভাবে পরীক্ষা করবে?
উপকরণ- একই রকমের তিনটি প্লেট, চামচ ও পানি।
কার্যপ্রণালী- প্লেট তিনটি পাশাপাশি রেখে, প্রথম প্লেটে এক চামচ, দ্বিতীয় প্লেটে দুই চামচ এবং তৃতীয় প্লেটে তিন চামচ পানি দিতে হবে। এবার প্লেটগুলাে লক্ষ্য করতে হবে।কিছু সময় পর দেখা যাবে, এক চামচ পানি যে প্লেটে দেয়া হয়েছিল, সেটা আগে শুকিয়ে গেছে, তারপর শুকিয়েছে যে প্লেটে দুই চামচ পানি ছিল এবং সবশেষে শুকিয়েছে তৃতীয় প্লেটটি, যেটাতে ছিল তিন চামচ পানি। এক্ষেত্রে আবহমণ্ডলের তাপমাত্রায় পানি আপনা থেকেই ধীরে ধীরে বাষ্পে পরিণত হয়েছে—এই প্রক্রিয়াকেই বলে বাষ্পীভবন। এটা হয় শুধু তরল পদার্থের উপরিভাগ থেকেই। অন্য একটি পরীক্ষার দ্বারাও তা প্রমাণ করা যায়। এ জন্য প্রয়ােজন একটি প্লেট একটি গ্লাস এবং মুখখােলা সরু লম্বা একটি বােতল। প্রতিটি পাত্রেই দুই চামচ করে পানি দিয়ে পাশাপাশি রাখতে হবে । প্রত্যেকটিতে সমান পরিমাণ পানি থাকলেও প্রত্যেকটি পাত্র কি একই সঙ্গে শূন্য হবে?
লক্ষ্য করতে হবে, কোন্ পাত্রটি আগে খালি হচ্ছে। প্রথমে খালি হচ্ছে প্লেটের পানি, তারপর গ্লাসের এবং সবশেষে বােতলের। এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে তরল পদার্থের উপরিভাগের ক্ষেত্রের আয়তন যত বেশি হবে বাষ্পীভবন তত বেশি হবে।
ফলাফল- পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হলাে, এই যে প্লেটের পানিগুলাে উড়ে বাতাসের জলীয় বাষ্পের সাথে মিশে যাচ্ছে এটাই হলাে বাষ্পীভবন ।
পরীক্ষার নামঃ-প্রত্যেকেই জানে বাতাস প্রবাহিত হয়। কিন্তু কিভাবে? বাতাসের গতির কারণ কি?
উপকরণ-কয়েক টুকরাে কাগজ দিয়ে বানাতে হবে একটা চরকি বা ঘুরঘুরি। আর লাগবে আঠা, আলপিন, চুলাে বা বুনসেন বার্নার।
কার্যপ্রণালী- এই পরীক্ষার জন্য প্রথমে বানাতে হবে একটা বায়ু-চক্র বা চরকি।এটা বানানাে কঠিন কিছু নয়। দৈর্ঘ্যে ২৫ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ২৫ সেন্টিমিটার অর্থাৎ বর্গাকার এক শিট কাগজ নিয়ে কোণাকুণি দুটি রেখা টান। দুটি রেখা পরস্পরকে যেখানে ছেদ করছে, সেখানে ১০ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি বৃত্ত অঙ্কিত কর। এবার কাঁচি দিয়ে বৃত্তের বর্হিভাগ পর্যন্ত চার রেখা বরাবর অংশগুলাে কাটো। এখন প্রতিটি অংশের কোণগুলি বৃত্তের কেন্দ্রস্থলে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দাও। মাঝখানে একটা আলপিন ঢুকিয়ে তার সঙ্গে জুড়ে দাও একটা লম্বা সরু কাঠি। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল ঘুরঘুরি বা চরকি।চুলাে বা বুনসেন বার্নারের প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে ধর এই ঘুরঘুরি। ঘুরঘুরি আপনাআপনি ঘুরতে শুরু করবে। কিন্তু উত্তাপের উৎস থেকে সরিয়ে নিলেই ঘােরা বন্ধ হয়ে যাবে। এটা কেন হয়? উত্তাপে বায়ু যখন সম্প্রসারিত হয়, তখন এর অনুগুলি (মলিকিউলস) উত্তাপের দরুণ হালকা হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বায়ুর যে অংশ উত্তাপ থেকে বাইরে আছে, তা ভারী অবস্থায় নিচের দিকে নামতে থাকে এবং গরম ও হালকা বায়ুকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। এভাবেই চক্রাকারে প্রবাহ সঞ্চারিত হয়। এবং বাতাস গতি লাভ করে।
ফলাফল- এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলাে, যে বাতাস প্রবাহিত হয় এবং বাতাসের গতি আছে ।