Responsive Ad Slot

Showing posts with label বিগব্যাং. Show all posts
Showing posts with label বিগব্যাং. Show all posts

বিগ ব্যাং, ব্ল্যাকহােল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন-০৩

No comments

Tuesday, 3 December 2024

সময় পার হবার সাথে সাথে গ্যালাক্সিতে উপস্থিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস মহাকর্ষের টানে গুটিয়ে গিয়ে ছােট ছােট আলাদা মেঘ গঠন করে। এই মেঘ সঙ্কুচিত হলে এর মধ্যে থাকা পরমাণু একে অপরের সাথে সংঘর্ষ করে করে গ্যাসের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একসময় এর তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে এতে নিউক্লিয়ার ফিউশন (সংযােজন) বিক্রিয়া শুরু হয়। এই ফিউশনের ফলে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিণত হয়। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিস্ফোরিত একটি হাইড্রোজেন বােমার মতাে এই বিক্রিয়ায় নিঃসৃত তাপের কারণেই একটি নক্ষত্র উজ্জ্বল হয়। এই বাড়তি তাপ গ্যাসের চাপও (বাইরের দিকে বাড়িয়ে তােলে। একসময় এই চাপ মহাকর্ষীয় টানের (যা কাজ করে ভেতরের দিকে, ঘটাতে চায় সঙ্কোচন) সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়তে পারে। এর ফলে গ্যাসের সঙ্কোচন বন্ধ হয়। এভাবেই এই মেঘ। আমাদের সূর্যের মতাে নক্ষত্রে পরিণত হয়। এরা হাইড্রোজেন গ্যাস জ্বালিয়ে হিলিয়ামে রূপান্তরিত করে, বিকিরণ করে তাপ ও আলাে । এর উদাহরণ অনেকটা বেলুনের মতাে-ভেতরে থাকা বাতাসের বাইরের দিকের প্রসারণ চাপ এবং বেলুনের রাবারের নিজস্ব টান (যা বেলুনকে ছােট করে ফেলতে চায়) একে অপরকে স্থির রাখে।

উত্তপ্ত গ্যাসের মেঘ একবার নক্ষত্র হয়ে গেলে তা বহু দিন ধরে স্থিতিশীল থাকে। এ অবস্থায় নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার তাপ ও মহাকর্ষীয় টান একে অপরকে ধরে রাখে। কিন্তু একসময় নক্ষত্রের হাইড্রোজেন ও অন্যান্য নিউক্লিয়ার জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলাে, শুরুতে একটি নক্ষত্রের যত বেশি পরিমাণ ভর থাকে, এটি তত তাড়াতাড়ি জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে। এর কারণ হচ্ছে, একটি নক্ষত্রের যত বেশি ভর থাকে এর মহাকর্ষীয় টানের সাথে ভারসাম্যে থাকতে একে তত বেশি উত্তপ্ত হতে হয় । আর নক্ষত্রটি যত বেশি উত্তপ্ত হবে তত দ্রুত গতিতে এর মধ্যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া হবে এবং তত দ্রুত এর জ্বালানি শেষ হবে। আমাদের সূর্যের কাছে যে জ্বালানি আছে তা দিয়ে এটি সম্ভবত আরও প্রায় পাঁচ বিলিয়ন (পাঁচশ কোটি) বছর চলতে পারবে । কিন্তু আরও বেশি ভরের নক্ষত্ররা একশ মিলিয়ন (দশ কোটি) বছরের মধ্যেও জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলতে পারে। এই সময়টি আমাদের মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় অনেক ছােট্ট । | জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্রটি আবার ঠাণ্ডা হতে শুরু করে । মহাকর্ষ। আবার বিজয়ী হয়। শুরু হয় সঙ্কোচন। এর ফলে পরমাণুরা একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায়। এর ফলে নক্ষত্রটি আবার উত্তপ্ত হতে থাকে । উত্তাপ আরও বাড়লে এবার এতে হিলিয়াম থেকে আরও ভারী মৌল যেমন কার্বন বা অক্সিজেন উৎপন্ন হবে। এরপর কী হবে তা পুরােপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু খুব সম্ভব, এর কেন্দ্রীয় অঞ্চল গুটিয়ে গিয়ে অতি ঘন অবস্থা যেমন ব্ল্যাকহােল বা কৃষ্ণ গহ্বর তৈরি করবে। ব্ল্যাকহােল শব্দটা নতুন।

আমেরিকান বিজ্ঞানী জন হুইলার ১৯৬৯ সালে শব্দটি তৈরি করেন। এর মাধ্যমে তিনি অন্তত দুই শ বছর আগের একটি ধারণার চিত্র তুলে ধরেন। এটা সেই সময়ের কথা যখন আলাে সম্পর্কে দুটো তত্ত্ব ছিল। একটি মত ছিল নিউটনের পছন্দনীয়। এই মত অনুসারে, আলাে কণা দিয়ে তৈরি ।। আরেকটি মতের বক্তব্য ছিল, আলাে তৈরি তরঙ্গ দিয়ে। এখন আমরা জানি, দুটো তত্ত্বই সঠিক। নবম অধ্যায়ে আমরা দেখব, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কণা-তরঙ্গের দ্বৈততায় (দ্বিমুখী আচরণ) আলােকে কণা ও তরঙ্গ দুই-ই মনে করা যায়। কণা ও তরঙ্গের ধারণাগুলাে আমরাই বানিয়েছি, এমন না যে। প্রকৃতির সব ঘটনা এর কোনাে একটির মতাে হতেই হবে। | আলােকে তরঙ্গ ধরে নিলে এটি মহাকর্ষের প্রভাবে কীভাবে কাজ করবে তা বােঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু আলােকে যদি আমরা কণায় তৈরি মনে করি, তাহলে এই কণারা কামানের গােলা, রকেট বা গ্রহদের মতােই মহাকর্ষ দ্বারা আকৃষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। যেমন একটি কামানের গােলাকে পৃথিবীর বা কোনাে নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে ওপরে ছুড়লে (নিচের ছবিতে দেখুন) একসময় এটি থেমে যাবে। এরপর এটি আবার নিচে নামতে থাকবে। তবে একে একটি নির্দিষ্ট বেগের চেয়ে জোরে ছুড়ে মারলে ভিন্ন | কিছু ঘটবে (এটি আর ফিরে আসবে না)। এই নূ্যনতম বেগকে বলে মুক্তি বেগ । কোনাে নক্ষত্রের মুক্তি বেগ নির্ভর করে এর মহাকর্ষী টানের ওপর । ভর বেশি হলে মুক্তি বেগের মানও হয় বেশি। একসময় মানুষ ভাবত আলাের গতি হলাে অসীম। এর ফলে মহাকর্ষ একে কিছুতেই থামাতে পারবে না। কিন্তু রােমা সাহেব আলাের নির্দিষ্ট গতির কথা আবিষ্কার করলে বােঝা গেল, এর ওপর মহাকর্ষের প্রভাব থাকতেও পারে। নক্ষত্রের ভর যথেষ্ট বেশি হলে আলাের বেগও হবে এর মুক্তি বেগের চেয়ে কম । ফলে নক্ষত্র থেকে বের হওয়া যেকোনাে আলাে আবার এতেই ফিরে আসবে।

এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ক্যামব্রিজের শিক্ষক জন মিচেল ১৭৮৩ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এটি লন্ডনের ফিলােসফিক্যাল ট্রানজেকশন অব দি রয়েল সােসাইটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন যে একটি নক্ষত্র যথেষ্ট আঁটসাঁট (আকারে ছােট) ও বেশি ভরবিশিষ্ট হলে এর শক্তিশালী মহাকর্ষের কারণে এর ভেতর থেকে আলাে বের হয়ে আসতে পারবে না । এর পৃষ্ঠ থেকে বের হওয়া যেকোনাে আলাে বেশি দূর যাবার আগেই এটার মহাকর্ষ তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে আসবে। এ ধরনের বস্তুদেরকে এখন আমরা ব্ল্যাকহােল বা কৃষ্ণগহ্বর বলি, কারণ এরা আসলেই তাই: মহাশূন্যের কালাে শূন্যতা ।

বিগ ব্যাং, ব্ল্যাকহােল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন-০৬

No comments

Wednesday, 15 April 2020

অনেক সময় একটি বড় ভরের নক্ষত্র গুটিয়ে যাওয়ার সময় এর বহিঃস্থ অঞ্চল তীব্র বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরে ছিটকে পড়তে পারে। একে বলা হয় সুপারনােভা । এই বিস্ফোরণের এত শক্তিশালী যে এটি একাই পুরাে গ্যালাক্সির বাকি সব নক্ষত্রের চেয়ে উজ্জ্বল হতে পারে। এ রকম একটি সুপারনােভার অবশিষ্টাংশকেই আমরা এখন কাঁকড়া নীহারিকা (Crab nebula) নামে চিনি। চীন দেশে ১০৫৪ সালে একে দেখার কথা লেখা আছে। এ ক্ষেত্রে বিস্ফোরিত নক্ষত্রটির দূরত্ব ছিল পাঁচ হাজার আলােকবর্ষ । এর পরেও বহু মাস ধরে একে খালি চোখে দেখা গিয়েছিল । এটি এত বেশি উজ্জ্বল ছিল যে একে দিনেরবেলায়ও দেখা যেত। রাতেরবেলায় এর আলােতে বই পড়া যেত । এটি যদি এর দশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ, পাঁচশ আলােকবর্ষ দূরে থাকত তবে এটি একশ গুণ উজ্জ্বল হতাে। সে ক্ষেত্রে রাত আর দিনের মধ্যে কোনাে পার্থক্য থাকত না। এই বিস্ফোরণের তীব্রতা পৃথিবীতে আলাে প্রদানের ক্ষেত্রে সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে পারত, যদিও সূর্য এর চেয়ে কোটি কোটি গুণ কাছে। মনে আছে নিশ্চয়ই, আমাদের সূর্যের দূরত্ব কিন্তু মাত্র ৮ আলােক মিনিট । এত কাছে যদি কোনাে সুপারনােভা থাকত, পৃথিবী নিজে ঠিকই থাকত, কিন্তু বিকিরণের কারণে সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যেত।


সম্প্রতি কেউ কেউ বলেছেনও যে প্রায় ২০ লাখ বছর আগে প্লাইস্টোসিন ও প্লয়ােসিন যুগের মাঝখানে যে সামুদ্রিক প্রাণীরা মারা পড়েছিল তাতেও একটি সুপারনােভা থেকে আসা মহাজাগতিক বিকিরণের ভূমিকা ছিল। এই সুপারনােভাটি ছিল আমাদের খুব কাছেই বৃশ্চিকসেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জে (star cluster)। কিছু বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, উন্নত প্রাণের উদ্ভব ঘটে গ্যালাক্সির সেই অঞ্চলের দিকে, যেখানে তারকার সংখ্যা খুব বেশি থাকে না । একে বলা হয় জোন অব লাইফ । কারণ বেশি তারকাময় অঞ্চলে নিয়মিত সুপারনােভাদের হানায় প্রাণের বিকাশে বাধা পড়ে। মহাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে প্রতিদিন লাখ লাখ সুপারনােভা বিস্ফোরিত হয়। একটি গ্যালাক্সিতে প্রায় প্রতি শতাব্দীতে একটি করে সুপারনােভার বিস্ফোরণ ঘটে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দুর্ভাগ্য যে জানা তথ্য মতে, মিল্কিওয়েতে সর্বশেষ সুপারনােভার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৬০৪ সালে, যখনও টেলিস্কোপ আবিষ্কৃতই হয়নি ।

আমাদের গ্যালাক্সিতে পরবর্তী সুপারনােভা বিস্ফোরণ ঘটানাের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে রাে ক্যাসিওপিই নামক নক্ষত্র । ভাগ্য ভালাে যে এটি আমাদের থেকে দশ হাজার আলােকবর্ষ দূরে আছে, যা আমাদের জন্য নিরাপদ দূরত্ব । এটি একটি হলুদ হাইপারজায়ান্ট (yellow hyper giant) শ্রেণির তারকা । মিল্কিওয়েতে আবিষ্কৃত মাত্র সাতটি হলুদ হাইপারজায়ান্টের মধ্যে এটি একটি। ১৯৯৩ সালে একদল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ এটি। নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরের কয়েক বছরে তাঁরা দেখলেন, এর তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমে কয়েক শ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠা-নামা করছে। এরপর ২০০০ সালের গ্রীষ্মে এর তাপমাত্রা হঠাৎ করে সাত হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে চার হাজারে নেমে আসে। একই সময় তারা এর বায়ুমণ্ডলে টাইটেনিয়াম অক্সাইড খুঁজে পান। তাঁদের মতে, একটি প্রচণ্ড শক ওয়েভের মাধ্যমে নক্ষত্রটি থেকে এই পদার্থ বাইরের দিকে চলে এসেছে ।


নক্ষত্রের জীবনের শেষের দিকে তৈরি কিছু ভারী পদার্থ সুপারনােভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নক্ষত্র তৈরিতে এই পদার্থগুলাে ভূমিকা রাখে। আমাদের সূর্যেই এ রকম দুই শতাংশ ভারী মৌল রয়েছে। আমাদের সূর্য হলাে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র । প্রায়। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এর জন্ম। এর আগে বিস্ফোরিত সুপারনােভার ধ্বংসাবশেষের ঘূর্ণনশীল গ্যাসীয় মেঘ থেকে এর সৃষ্টি। সেই মেঘের বেশির ভাগ অংশই হয় সূর্য তৈরিতে কাজে লেগেছে অথবা আরও দূরে ছিটকে গেছে । অল্প কিছু পরিমাণ ভারী মৌল জড় হয়ে আমাদের পৃথিবীর মতাে গ্রহদের জন্ম হয়েছে, যারা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আমাদের অলঙ্কার তৈরির স্বর্ণ এবং নিউক্লিয়ার চুল্লির ইউরেনিয়াম-দুটোই সৌরজগতের জন্মের আগে কোনাে সুপারনােভা বিস্ফোরণের ফসল!

বিগ ব্যাং, ব্ল্যাকহােল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন-০৫

No comments

একটি বিশাল ভরের নক্ষত্র গুটিয়ে ব্ল্যাক হােল তৈরি হবার সময় কী দেখা যাবে? এটা জানতে হলে মাথায় রাখতে হবে যে আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে পরম সময় বলতে কিছু নেই। অন্য কথায়, প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতাে করে সময় মাপবেন। নক্ষত্রের পৃষ্ঠে অবস্থান করলে যে সময় পাওয়া যাবে, দূরে অবস্থান করা কেউ তার চেয়ে ভিন্ন সময় পাবেন । এর কারণ হলাে, নক্ষত্রের পৃষ্ঠে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বেশি শক্তিশালী।

এখন ধরুন, একটি নক্ষত্র ভেতরের দিকে গুটিয়ে যাওয়ার সময় এক অকুতােভয় নভােচারী এর পৃষ্ঠে বসে আছেন। কোনাে একসময় হয়তাে। তাঁর ঘড়িতে দেখা গেল ১১:০০টা বাজে। ঠিক এই সময় নক্ষত্রটি সঙ্কট ব্যাসার্ধ° পার হয়ে আরও ছােট হয়ে গেল। এখন এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এতটা শক্তিশালী হল যে কিছুই আর বের হতে পারবে না। এখন ধরুন, তাকে বলা হয়েছিল যে ঘড়ি দেখে প্রতি সেকেন্ডে একটি করে সঙ্কেত পাঠাতে হবে । সঙ্কেত গ্রহণ করার জন্য একটু দূরে একটি মহাকাশযান নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে । তিনি যখন সঙ্কেত পাঠানাে শুরু করেন তখন সময় ১০:৫৯:৫৮। অর্থাৎ, ১১:০০টা বাজতে আর দুই সেকেন্ড বাকি। এখন মহাকাশযানে বসে তাঁর সাথীরা কী দেখতে পাবেন?

এর আগে আমরা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে দেখেছিলাম মহাকর্ষের কারণে রকেটের ভেতরে সময় ধীরে চলে । মহাকর্ষ শক্তিশালী হলে এই প্রভাবও হয় বেশি। নক্ষত্রের পৃষ্ঠে থাকা নভােচারীর কাছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মান তাঁর সাথীদের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে তাঁর কাছে যেটা এক সেকেন্ড, সেটাই তাঁর সাথীদের কাছে আরও বেশি সময় মনে হবে । নক্ষত্র গুটিয়ে যাবার সময় তিনিও যখন ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছেন, মহাকর্ষ ক্রমেই তত শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে মহাকাশযানের যাত্রীদের কাছে তাঁর পাঠানাে বিভিন্ন সঙ্কেতের মধ্যবর্তী সময় ক্রমেই লম্বা মনে হতে থাকবে । সময়ের এই প্রসারণ ১০:৫৯:৫৯ এর আগে খুব ক্ষুদ্র হবে। তাই মহাকাশযানের যাত্রীদেরকে ১০:৫৯:৫৮ এবং ১০:৫৯:৫৯ সময়ে পাঠানাে সঙ্কেত দুটি পেতে এক সেকেন্ডের চেয়ে সামান্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ১১:০০টার সময় পাঠানাে সঙ্কেত পেতে তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে চিরকাল।

১০:৫৯:৫৯ ও ১১:০০টার মধ্যবর্তী সময়ে নক্ষত্রের পৃষ্ঠে যা কিছু ঘটবে তা মহাকাশযান থেকে দেখতে অসীম সময়ের প্রয়ােজন হবে। ১১:০০টা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নভােচারীর পাঠানাের সঙ্কেতের মতােই আলাের তরঙ্গের পর্যায়ক্রমিক খাঁজ ও চূড়ার পার্থক্য লম্বা হতে থাকবে। আমরা জানি, প্রতি সেকেন্ডে সৃষ্ট চূড়া ও খাঁজের সংখ্যাকেই আলাের কম্পাঙ্ক বলে। অতএব, মহাকাশযানের দর্শকদের কাছে নক্ষত্রের আলাের কম্পাঙ্ক কমে যেতে থাকবে । এই আলাে তাই ধীরে ধীরে লাল (এবং ঝাপসা) হতে থাকবে। একসময় নক্ষত্রটি এত অনুজ্জ্বল হয়ে যাবে যে একে আর যান থেকে দেখা যাবে না। সামনে শুধুই পড়ে থাকবে মহাশূন্যের এক কালাে গহ্বর । তবে যানের ওপর এর মহাকর্ষীয় টান চলতেই থাকবে এবং যানটিও একে ঘিরে চলতে থাকবে ।

এই দৃশ্য অবশ্য পুরােপুরি বাস্তবসম্মত নয়। এতে একটু সমস্যা আছে । নক্ষত্র থেকে দূরের দিকে মহাকর্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের নির্ভীক নভােচারীর পায়ের কাছে মহাকর্ষ সব সময় তার মাথার চেয়ে বেশি হবে । মহাকর্ষের এই পার্থক্য তাকে সেমাইয়ের মতাে টেনে লম্বা করে দেবে। এর ফলে নক্ষত্রটি সঙ্কট ব্যাসার্ধে পৌছে ঘটনা দিগন্ত তৈরি করার আগেই তিনি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। অবশ্য আমাদের বিশ্বাস, মহাবিশ্বে আরও বড় বড় বস্তুও আছে। যেমন গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলেও মহাকর্ষীয় সঙ্কোচনের ফলে ব্ল্যাকহোেল তৈরি হতে পারে। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই এ রকম একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহােল আছে । এ ধরনের কোনাে ব্ল্যাকহোেল অভিযানে গেলে নভােচারীকে আগের মতাে বিপদে পড়তে হবে।

সঙ্কট ব্যাসার্ধে পৌছেও তাঁর বিশেষ কোনাে অনুভূতি হবে না। তিনি নিজের অজান্তেই পয়েন্ট অব নাে রিটার্ন (point of no return, অর্থাৎ যা থেকে আর ফিরে আসা যাবে না) পার হয়ে যাবেন । অবশ্য বাইরে থেকে দেখতে আগের মতােই তাঁর পাঠানাে সঙ্কেত দীর্ঘস্থায়ী হতে হতে একসময় হারিয়ে যাবে । আর নভােচারীর ঘড়ি অনুসারে আরও কয়েক ঘণ্টা পরে ঠিকই বিপদ দেখা দেবে । মহাকর্ষের ফলে সঙ্কোচন অব্যাহত থাকায় একসময় তার মাথা ও পায়ের কাছে মহাকর্ষীয় বলের পার্থক্য এত বেশি হবে যে তিনি আগের মতােই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন ।

চিত্র : মহাকর্ষীয় টান 

দূরত্বের সাথে সাথে মহাকর্ষ দুর্বল হতে থাকে বলে পৃথিবীর আকর্ষণ আপনার পায়ের চেয়ে মাথায় মহাকর্ষীয় টান কম! এখানে পার্থক্য এক মিটার বা তার কাছাকাছি, তাই এখানে মহাকর্ষের পার্থক্য খুব সামান্য বলে তা আত্রা টের পাই না। কিন্তু ব্ল্যাক হােলের কাছে থাকা একজন নভােচারী ঠিকই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বেন।

বিগ ব্যাং, ব্ল্যাকহােল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন-০৭

No comments

Tuesday, 17 March 2020

নতুন অবস্থায় যখন পৃথিবী ঘনীভূত হয়েছিল, তখন এর উত্তাপ ছিল খুব বেশি, ছিল না কোনাে বায়ুমণ্ডল । আস্তে আস্তে এটি ঠাণ্ডা হলাে। বিভিন্ন পাথর থেকে নির্গত গ্যাস গড়ে তুলল বায়ুমণ্ডল । প্রাথমিক এই বায়ুমণ্ডল নিয়ে আমরা কিন্তু বাঁচতে পারতাম না। এতে কোনাে অক্সিজেন ছিল না। তবে এতে অন্য গ্যাস ঠিকই ছিল, কিন্তু তা ছিল বিষাক্ত। যেমন, এতে ছিল হাইড্রোজেন সালফাইড (পচা ডিমে এই গ্যাস থাকার কারণেই তা গন্ধ ছড়ায়)। তবে প্রাণের কিছু আদি রূপ এই পরিবেশেও টিকতে পারত।

ধারণা করা হয় এদের উৎপত্তি সাগরে । দৈব প্রক্রিয়ায় পরমাণু থেকে এদের বড় কাঠামাে বা বড় অণু (macromolecule) তৈরি হয়। এটিও আবার অন্য পরমাণুকে যুক্ত করে একই ধরনের কাঠামাে গঠন করে। এতে পুনরুৎপাদিত হতে হতে সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে পুনরুৎপাদনের সময় থেকে যায় ক্রটি। এই ত্রুটিগুলাে এমন যে নতুন বড় অণু নিজে নিজে তৈরি হতে না পেরে নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু কিছু ত্রুটি থেকে এমন কিছু বড় অণু তৈরি হতাে, যা আগের চেয়ে ভালােভাবে পুনরুৎপাদিত হতে পারে। এরা একটু সুবিধাজনক জায়গায় থাকায় আগের বড় অণুদের জায়গা দখলে। নিত। এইভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে জটিল থেকে জটিলতর স্ব-উৎপাদনশীল প্রাণীর সৃষ্টি হয় । প্রাথমিক যুগের প্রাণীরা হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন পদার্থ গ্রহণ করত এবং অক্সিজেন ছেড়ে দিত । ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলের উপাদান পাল্টাল । উন্নত ধরনের প্রাণী যেমন মাছ, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের আবির্ভাব ঘটল। | বিংশ শতকে এসে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে যায়। আমরা বুঝতে পারি, বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের স্থান অতি নগণ্য; বুঝতে পারি সময় ও স্থান বক্র ও অবিচ্ছেদ্য; মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে এবং এর একটা শুরু আছে ।


মহাবিশ্ব শুরুতে উত্তপ্ত ছিল এবং পরে প্রসারিত হয়ে ধীরে ধীরে শীতল হয়-এই তথ্য আমরা পাই আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব-সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে । আজ পর্যন্ত এর সব অনুমান পর্যবেক্ষণের সাথে মিলে গেছে, যা এই তত্ত্বের এক বড় বিজয়। কিন্তু গণিত অসীম সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে ব্যর্থ । অথচ বিগ ব্যাং থিওরি অনুসারে একসময় মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও স্থান-কালের বক্রতা ছিল অসীম । ফলে মহাবিশ্বের একটি বিন্দুতে গিয়ে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব নিজেই নিজের অকার্যকরতা ও ব্যর্থতার কথা ঘােষণা করছে। গণিতে এ ধরনের বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। কোনাে তত্ত্ব যখন অসীম ঘনত্ব, বক্রতা ইত্যাদির মতাে সিঙ্গুলারিটির কথা বলে, বুঝতে হবে তত্ত্বে কিছু ভুল আছে। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব একটি আংশিক তত্ত্ব, কারণ মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল এটি আমাদেরকে তা বলতে অক্ষম।


সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব ছাড়াও বিংশ শতকে আমরা প্রকৃতি সম্পর্কে আরেকটি আংশিক তত্ত্ব পেয়েছি । এটি হলাে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। খুবই ক্ষুদ্র মাপের জগতের ঘটনাবলি নিয়ে এর কাজ।

বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে আমরা জানি যে মহাবিশ্ব একসময় এত ক্ষুদ্র ছিল যে সেই অবস্থায় এর বড় মাপের গঠন নিয়ে চিন্তা করতে গেলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষুদ্র প্রতিক্রিয়াও মাথায় রাখতে হবে। আমরা পরের অধ্যায়ে দেখব যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বকে পুরােপুরি বুঝতে আমরা এই দুটি তত্ত্বের ওপরই নির্ভর করছি। এই দুটো আংশিক তত্ত্বকে জোড়া লাগিয়ে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি নামে একটিমাত্র তত্ত্ব তৈরি করতে হবে। এতে বিজ্ঞানের সাধারণ সব সূত্র সর্বত্র কাজ করবে, এমনকি সময়ের শুরুতেও । কোনাে সিঙ্গুলারিটির প্রয়ােজন হবে না ।


অনুবাদকের নােট

১. ভারী বলার অর্থ হচ্ছে এতে প্রােটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রনের সংখ্যা বেড়ে যায় । প্রথমে এক প্রােটনের হাইড্রোজেন থেকে দুই প্রােটনের হিলিয়াম হতে থাকে। পরে আরও বেশি প্রােটনবিশিষ্ট পরমাণুরা গঠিত হয়।

২. সূর্যের কয়েক লাখ থেকে শুরু করে কয়েক বিলিয়ন বা তারও বেশি ভরের ব্ল্যাকহােলদের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহােল বলে । এরা সাধারণত বিভিন্ন গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে।

৩. সঙ্কট ব্যাসার্ধ হলাে নক্ষত্রের সেই ব্যাসার্ধ, যাতে পৌছলে এর ঘটনা দিগন্ত নামক অঞ্চল তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, এটি ব্ল্যাকহোেল হবার জন্য তৈরি হয়।

৪. অর্থাৎ, সেই সঙ্কেত আর কোনাে দিনই পাওয়া যাবে না, কারণ ততক্ষণে নক্ষত্রটি ব্ল্যাক হয়ে গেছে এবং কিছুই আর এখান থেকে বের হবে না।

Don't Miss
© all rights reserved.
Made with by Science Tech BD